top of page

সাইবার আইন: নিরাপত্তা নাকি নাগরিক স্বাধীনতায় শৃঙ্খল?


১. ভূমিকাঃ

ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন ইত্যাদি এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এর সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানাধরনের সাইবার অপরাধ, যেমন: হ্যাকিং, অনলাইন প্রতারণা, গুজব, সাইবার বুলিং এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল, ইত্যাদি। এসব অপরাধ থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে ঠিকই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই আইনগুলো কি সত্যিই নাগরিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি উল্টো তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করছে?


বাংলাদেশের সাইবার আইনগুলোর ইতিহাস ও প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, নিরাপত্তা সুরক্ষার তুলনায় নাগরিক অধিকার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাই অধিক প্রাধান্য পেয়েছে। এ আলোচনায় আমরা পর্যায়ক্রমে দেখব যে বাংলাদেশে সাইবার আইনের বিকাশের ধাপগুলো, কেন ও কীভাবে এসব আইন সমালোচিত হয়েছে, আন্তর্জাতিকপ্রেক্ষাপটের সাথে এর তুলনামূলক অবস্থান, দেশের বাস্তবতায় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, এবং সর্বশেষপ্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ আসলে পুরোনো সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটবে কিনা, তার একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনা এবং আলোচনার পরিসমাপ্তি টানা হবে এই প্রশ্নে যে বাংলাদেশের সাইবার আইন কোন পথে অগ্রসর হচ্ছে?


২. বাংলাদেশর প্রেক্ষাপটে সাইবার আইনের বিবর্তন:

২০০৬ সালের পূর্বে সাইবার সুরক্ষা নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। এ সময় মূলত দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী যেকোনো অপরাধ কে সংজ্ঞায়িত করা হত। বাংলাদেশে সাইবার জগৎ নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনের যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (ICT Act) এর মাধ্যমে। শুরুতে এই আইন নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও ২০১৩ সালের সংশোধনীতে এর ৫৭ ধারাটি কুখ্যাত হয়ে ওঠে। এই ধারায় সংবিধানের তৃতীয় ধারায় বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী নানা উপাদান থাকায় এটি ব্যাপক সমালোচিত হয়।এই সমালোচনার মুখে সরকার ICT আইন বাতিল করে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) প্রণয়ন করে। কিন্তু এই আইনটি যেন আরও কঠোর রূপে আবির্ভূত হয়। এর বহু ধারা, যেমন ২১, ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১, এতটাই অস্পষ্ট এবং কঠোর ছিল যে, গণমাধ্যমকর্মী, লেখক ও সাধারণ নাগরিকরা এর যথেচ্ছ ব্যবহারের শিকার হতে থাকেন। অবশেষে ব্যাপক চাপের মুখে ২০২৩ সালে সরকার DSA বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন(CSA), ২০২৩ প্রণয়ন করে। যদিও বলা হয়েছিল এটি একটি উন্নত সংস্করণ, সমালোচকরা মনে করেন, এটি মূলতডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেরই একটি নতুন মোড়ক। অনেকগুলো বিতর্কিত ধারা সামান্য পরিবর্তন করে বা শাস্তির মাত্রা কমিয়ে এতে রেখে দেওয়া হয়েছে।


যেকোনো আইনকে অবশ্যই দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে, চিন্তা বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৬, অনুচ্ছেদ ৭(২) থেকে প্রতিমান হয় যে, কোন আইন যদি সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে উক্ত আইন কার্যকারিতা হারাবে। অধিকন্তু, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে, উচ্চ আদালত, তথাপি, সুপ্রিম কোর্টকে জুডিশিয়াল রিভিউয়ের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে এবং সংবিধানকে সমুন্নত রাখার ক্ষমতা উচ্চ আদালতকে প্রদান করা হয়েছে। উক্ত বর্ণিত ক্ষমতা বলে, উচ্চ আদালত যেকোনো আইন যা কিনা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে।

 

৩. আইনগুলো কেন এত সমালোচিত?

সাইবার অপরাধ দমনের নামে প্রণীত আইনগুলো একদিকে রাষ্ট্রকে যেমন অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নাগরিক অধিকারকে গুরুতর হুমকির মুখে ফেলেছে। এই আইনগুলোর অস্পষ্ট সংজ্ঞা, নির্বিচার ক্ষমতা এবং এর প্রয়োগে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক ভয় ও শঙ্কার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই সংকুচিত করে। এর প্রধান কারণগুলো নিম্নে বর্ণিত হলোঃ


৩.১. অস্পষ্ট ও বিস্তৃত ভাষা

আইনের ধারাগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে এমন শব্দ, যেগুলো স্বভাবতই দ্ব্যর্থবোধক ও ব্যাখ্যা-নির্ভর, যেমন: “ভুয়া”, “মানহানিকর”, “আপত্তিকর”, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”, কিংবা “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী”। এসব শব্দব্যক্তি ও প্রেক্ষাপট ভেদে ভিন্ন অর্থ বহন করে, ফলে পুলিশ বা প্রশাসনের হাতে যে কোনো ভিন্নমত, সমালোচনামূলক প্ৰতিবেদন, ব্যঙ্গচিত্র বা সৃষ্টিশীল অভিব্যক্তি সহজেই অপরাধে পরিণত হতে পারে।উদাহরণস্বরূপঃ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ২১ ধারা এমন অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকা জরিমানার বিধান রেখেছিল, যা পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এ কিছুটা নমনীয় করা হলেও এখনো সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং কোটি টাকার বেশি জরিমানার বিধান বহাল আছে।


৩.২. মতপ্রকাশ ও ভিন্নমতের অপরাধীকরণ

আইনের একাধিক ধারা সমালোচনামূলক বক্তব্যকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যেমনঃ "মানহানিকর মন্তব্য”, “মিথ্যা তথ্য প্রচার”, বা “রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রচারণা”। কুখ্যাত আইসিটি আইন ২০০৬-এর ৫৭ ধারা থেকে শুরু করে পরবর্তী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পর্যন্ত এসব বিধান কেবল ভাষার আড়ালে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাখা হয়েছে। এর ফলে অসংখ্য সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিক শুধুমাত্র সমালোচনা করার অপরাধে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষত, ধারা ২৯-এর অধীনে মানহানির মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ছাড়াও অন্য কেউ মামলা করতে পারেন যা এর অপব্যবহারকে আরও সহজতর করেছে।


৩.৩. অতিরিক্ত শাস্তি ও বিচার-পূর্ব হয়রানি

আইনে অনেক অপরাধের জন্য নির্ধারিত হয়েছে কঠোর শাস্তি, যেমন: জীবনব্যাপী কারাদণ্ড, জামিন অযোগ্যতা, এমনকি বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তারের সুযোগ। বাস্তবে দেখা গেছে, সামান্য সন্দেহের ভিত্তিতেই মানুষকে দীর্ঘদিন আটক রাখা হয়, যা বিচার প্রক্রিয়ার আগেই তাদের সামাজিক ও পেশাগত জীবন ধ্বংস করে দেয়। তদুপরি, পুলিশ ওগোয়েন্দা সংস্থাকে ফোন, ল্যাপটপ বা ডিজিটাল কনটেন্ট জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে , যার উপর কার্যত কোনো কার্যকর বিচারিক তদারকি নেই।


৩.৪. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্বিচার প্রয়োগ

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে “জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় যেকোনো ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো প্রায় বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে থেকে যায়, ফলে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা ভিন্ন মতের কণ্ঠস্বর নীরবে গায়েব হয়ে যেতে সময় লাগে না।


৩.৫. গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার উপর দমনপীড়ন

সাইবার আইনগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণ ও ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে। যারা দুর্নীতি উন্মোচন করেন বা সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন, তাদের অফিসে হানা, অনলাইন কনটেন্ট মুছে ফেলা বা মামলায় জড়িয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এর ফলে গণমাধ্যমগুলো এক ধরনের সেলফ-সেন্সরশিপ বাস্ব-আরোপিত বিধিনিষেধ আরোপ করতে বাধ্য হচ্ছে।


৩.৬. ডিজিটাল অংশগ্রহণে ভয় ও আত্ম-সেন্সরশিপ

শত শত মামলা দায়ের হওয়ার কারণে সাংবাদিক, ব্লগার, অধিকারকর্মী এমনকি সাধারণ নাগরিকও এখন নিজেরাই আত্ম-সেন্সরশিপে বাধ্য হচ্ছেন। যে কোনো বক্তব্য দেওয়ার আগে মনে প্রশ্ন জাগে “আমি কি মামলা খেয়ে যাব?”। এই ভয় শুধু মুক্ত আলোচনা ও মতের বহুমাত্রিকতাকেই স্তব্ধ করছে না, বরং নতুন চিন্তা, গবেষণা এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের পরিবেশকেও রুদ্ধ করে দিচ্ছে।


পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইনগুলো একদিকে রাষ্ট্রকে নজির বিহীন ক্ষমতা প্রদান করছে, অপরদিকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে। অস্পষ্ট সংজ্ঞা, অতিরিক্ত ক্ষমতা, এবংবিচারহীনতার সংস্কৃতি মিলিত হয়ে একটি ভয়ভীতিমূলক পরিবেশ তৈরি করছে, যা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি।

 

৪. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এর সাথে তুলনামূলক আলোচনা:

বাংলাদেশের সাইবার আইনগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এর অবস্থান বোঝা জরুরি।


৪.১. উন্নত বিশ্বের মানদণ্ড: যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্র এর অত্যাধুনিক ও সাম্প্রতিক হালনাগাদকৃত সাইবার আইন রয়েছে, যা ডেটা প্রোটেকশন, ই-ট্রানজ্যাকশন, সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল প্রমাণ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র কভার করে।


General Data Protection Regulation (GDPR): ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই যুগান্তকারী আইনটি বিশ্বজুড়ে ডেটা সুরক্ষার মানদণ্ড স্থাপন করেছে।


CFAA ও CISA: যুক্তরাষ্ট্রের The Computer Fraud and Abuse Act (CFAA) এবং Cybersecurity and Infrastructure Security Agency (CISA)-এর মতো আইন ও সংস্থাগুলো সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো রক্ষায় কাজ করে।


এই দেশগুলোতে ENISA (EU) বা CISA (USA)-এর মতো বিশেষায়িত সংস্থা রয়েছে, যারা নিয়মিত সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে।


৪.২. আঞ্চলিক মানদণ্ড: ভারত

এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সাইবার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে অনেক এগিয়ে। এর প্রধান কারণগুলো হলোঃ


অগ্রগামী আইনঃ ভারত ২০০০ সালে 'Information Technology Act, 2000 (IT Act)' পাস করে, যা বাংলাদেশের ICT Act, 2006 এর আগেই প্রণীত। এই আইনের মাধ্যমে তারা ইলেকট্রনিক রেকর্ড, সাইবার অপরাধ, ই-কমার্স, ডেটা প্রটেকশন ও ডিজিটাল সাক্ষর-এর আইনি ভিত্তি স্থাপন করে। আইনটি ২০০৮ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ডেটা প্রাইভেসি, সাইবার টেরোরিজম, এবং শিশু পর্নোগ্রাফির মতো বিষয় যুক্ত হয়। বাংলাদেশে প্রথম আইনি কাঠামো তৈরি করে ২০০৬ সালে এবং তারপর থেকে বিভিন্ন সংশোধনী, কিন্তু তাতে অনেক অস্পষ্টতাও দমনমূলক ধারা থেকে যায় (যেমন: ICT Act এর ৫৭ ধারা, DSA এর বিভিন্ন ধারা)। প্রাথমিক আইনগুলোমূলত সাধারণ সাইবার অপরাধ ও ই-রেকর্ড/ই-সিগনেচার বিষয়েই সীমিত। আইনি কাঠামো এখনো প্রক্রিয়াধীন ও খণ্ডখণ্ড, যার ফলে কিছু বিধান পরস্পরবিরোধী ও পুরোনো হয়ে গেছে।


শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: ভারতে রয়েছে Cyber Crime Investigation Cell, CERT - In (Indian Computer Emergency Response Team) এবং National Critical Information Infrastructure Protection Centre (NCIIPC) যারা পেশাদারভাবে সাইবার হামলা ও অপরাধ প্রতিরোধ করে। বাংলাদেশের শুধুমাত্র ঢাকায় একটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে বেশিরভাগ সাইবার অপরাধ; অপরাধ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পায় না।


বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা: ভারতের বিচার বিভাগ নাগরিক অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত সক্রিয়।উদাহরণস্বরূপ: ভারতীয় IT Act 2000, এ অধিক নির্দিষ্ট ও পরিস্কার সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে আইনের অপব্যবহার কম হয়। কিছু বিতর্কিত ধারা (যেমন: Section 66A) সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ সালে বাতিল করে দেয়নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণে [Shreya Singhal v. Union of India, AIR 2015 SC 1523]। ব্যক্তিগত গোপনতা (right to privacy) নিয়ে Justice K. S. Puttaswamy (Retd.) and Anr vs. Union of India and Ors.-এ সুপ্রিম কোর্ট privacy-কে মৌলিক অধিকার ঘোষণা করেছে। এছারাও, বর্তমানে অনেক দেশ এর দক্ষ তদন্তকারী, ডিজিটাল ফরেনসিক টিম, এবং সাইবার-বিশেষজ্ঞ বিচারকগণ আছে অপর দিকে বাংলাদেশ এর প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ ও ফরেনসিক সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। পুলিশ বাবিচারকদের অনেকেই সাইবার অপরাধ নিয়ে যথাযথভাবে অবগত নন।

 

৫. বাংলাদেশের বাস্তবতা: আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি

উপরের মানদণ্ডগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের সাইবার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকায় মাত্র একটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হয়েছে, ফলে মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রিতা ব্যাপক। তাছাড়া অপর্যাপ্ত বাজেট, অবকাঠামো ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের কারণে আইনের প্রয়োগ দুর্বল। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে, সাইবার ল নিয়ে আমাদের পলিসি মেকিং বা নীতি নির্ধারণী দুর্বলতা। রাজনৈতিক দলসমূহ অংশীজনের নীতিনির্ধারণ বিষয়ে অংশগ্রহণ প্রায় নেই বললেই চলে। এছাড়াও বিদ্যমান রাজনৈতিক দলসমূহের সাইবার বিষয়ক আইন নিয়ে, এমন কোন নীতি নির্ধারণী চোখে পড়ার মত নেই।

 

৬. সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫: আশার আলো নাকি পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি?

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বহুল সমালোচিত সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর সংশোধন বা রহিতকরণ। এরই ধারাবাহিকতায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।

অধ্যাদেশটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছেঃ ‘যেহেতু সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এ নাগরিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান অপ্রতুল থাকার কারণে উহা অপপ্রয়োগ ও নিপীড়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে; এবং যেহেতু মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার খর্ব করিবার কারণে উক্ত আইন রহিত করিয়া সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন ও এতদ্ সংক্রান্ত অপরাধের বিচারসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা সমীচীন;’ উক্ত প্রস্তাবনাটির মাধ্যমে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পূর্বের আইন সমূহ ছিল অপপ্রয়োগ ও নিপীড়নের হাতিয়ার এবং তা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। এখন, আলোচনার বিষয় হোলো, সাইবারসুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ কতোটা আধুনিক বা যুগোপযোগী।


৬.১. অধ্যাদেশের ইতিবাচক দিক


ক। সেক্সটরশন ও রিভেঞ্জ পর্নকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি: আইনটিতে নিশ্চিত ভাবে বেশ কিছু আধুনিকায়ন করা হয়েছে। যেমন সেক্সটরশন ও রিভেঞ্জ পর্ন এর মত অপরাধ এর শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। বহু বছর ধরে অনেক মানুষ এই বিষয়গুলোর জন্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বনামধন্য আইন সংস্থা মাহবুব অ্যান্ড কোম্পানির অ্যাসোসিয়েট রিফাত রহমানের মতে, "এটি একটি মোড় পরিবর্তনকারী বিধান, যা ভুক্তভোগীদের বহু বছরের আকাক্ষার প্রতিফলন।" সেক্সটরশনকে এখন অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এই মর্মে যে যেখানে কেউ কাউকে ভয দেখিয়ে তার ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি/ভিডিও প্রকাশ করে অর্থ, অনুগ্রহ বা যৌন সুবিধা আদায় করলে তা সেক্সটরশন অপরাধ বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে কেউ যদি কারো ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও তার অনুমতি ছাড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ক্ষতি সাধনের জন্য ছড়িয়ে দেয় তাহলে তা রিভেঞ্জ পর্ন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।


এই দুইটি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। ভুক্তভোগী যদি নারী হন বা ১৮ বছরের নিচে হন, তাহলে শাস্তি বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২০ লক্ষ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এই আইন শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেয় না, নিরাপদের সুরক্ষাও দেয়।


খ। AI ও ডিপফেইকের অপব্যবহার রোধ: এই আইনে AI-জেনারেটেড ডিপফেইক বা ম্যানিপুলেটেড কনটেন্ট-এর ক্ষতিকর ব্যবহারকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।


গ। জ্ঞানচর্চা ও সাংবাদিকতার সুরক্ষা: অধ্যাদেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শিক্ষামূলক, চিকিৎসাসংক্রান্ত এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যে তৈরি কনটেন্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।


৬.২. সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা: উদ্বেগ কি পুরোপুরি কেটেছে?

কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও অধ্যাদেশটির কয়েকটি দিক নিয়ে উদ্বেগ ও সমালোচনার সুযোগ রয়েগেছে। এ বিষয়ে Transparency International Bangladesh (TIB) রিপোর্ট এর পর্যালোচনা হল:


(১) এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পাবলিক কনসালটেশন বা স্বচ্ছতা অনুপস্থিত। এতে করে আইনটি গণমুখী হয়নি বলে আশঙ্কা।


(২) অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ, অনলাইন সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ব্লকচেইন, API, ইত্যাদির মত বহু টেকনিক্যাল শব্দের সংযোজন করা হয়েছে। কিন্তু এসবের সংজ্ঞা বা সাধারণ মানুষের কাছে বোঝার উপযোগিতা অনুপস্থিত যা একে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জটিল করে তুলেছে।


(৩) কিছু জায়গায় "সাইবার নিরাপত্তা" এবং কিছু জায়গায় "সাইবার সুরক্ষা" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর। অধ্যাদেশে বিভিন্ন ধারায় জটিল ও দুর্বোধ্য ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণ ব্যবহারকারী বা আইনের লোকজনের জন্যও বোধগম্য নয়।


৬.৩. বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া: গভীর উদ্বেগ ও সমালোচনা

অধ্যাদেশটি প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।


ক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি): সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়ে টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪ সম্পর্কে পর্যালোচনা ও সুপারিশ উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ এরশাদুল করিম। তার মতে, ‘আমরা গভীর হতাশা এবং উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, জনসাধারণের মতামত দেওয়ার জন্য আলোচ্য অধ্যাদেশের যে খসড়া প্রচার করা হয়েছিল, তার বাইরে অনুমোদন পাওয়া অধ্যাদেশে এমন নতুন অনেককিছু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আইন প্রণয়নের সাধারণ চর্চার পরিপন্থী। ব্যাপারটিকে সাধারণ মানুষকে ধোঁকাদেওয়া ও বোকা বানানোর একটি অপচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।' টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, অধ্যাদেশ টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপত্তি তুলেন এবং মতদেন: ‘এটা একটা জগাখিচুড়ি আইন হয়েছে, যার ফলে সাইবার সুরক্ষার নামে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ও সাইবার সিকিউরিটি আইনের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাই। অধিকার ভিত্তিক কিছু আমরা এই অধ্যাদেশে দেখতে পাই না৷ বাক স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমরা মনেকরি। এটা জনস্বার্থের প্রতিফলন করবে না, বরং বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে বলেআমরা মনে করি’


খ। আর্টিকেল ১৯: এছাড়াও ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্টিকেল ১৯ বলেছে, খসড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বর্তমান রূপ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এই সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির আগে সরকার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলক ও কার্যকর পরামর্শ করেনি। অধ্যাদেশের ধারা ৮-এ নির্বাহী বিভাগকে অসীম ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের আপত্তিকর মনে হওয়া যেকোনো তথ্য ব্লক বা ফিল্টার করতে পারবে। চতুর্থ অধ্যায়ের ধারা ১২ ও ১৩ অনুযায়ী, একটি জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।আর্টিকেল ১৯-এর মতে, এই কাউন্সিলকে অপরিসীম ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক নীতিনির্ধারণ, বিধি প্রণয়ন এবং 'সাইবার সুরক্ষা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। এছাড়াও, সংস্থাটি মন্তব্য করে ডিজিটাল আইন হতে হবে স্বচ্ছ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা-সুরক্ষাকারী।


গ। রাজনৈতিক অঙ্গনের উদ্বেগ: সম্প্রতি গৃহীত সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ ২০২৫ নিয়ে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতাদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। তাদের মতে, এই আইন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরং মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করছে। “সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ ২০২৫: কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে?” শীর্ষক আলোচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন: “অ্যামেন্ডমেন্ট আনা হলেও আইনে এখনও অস্পষ্ট ধারা রয়েছে এবং পুরাতন মামলায় জামিনপ্রাপ্তব্যক্তিদের পুনরায় গ্রেপ্তার করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটা একদিকে অযৌক্তিক, অন্যদিকে অন্যায়”


নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, যিনি সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন, তিনি বলেন: “আইনের ৩৫ ধারা পুলিশকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়েছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ খুলে দিয়েছে”

 

৭. উপসংহার: কোন পথে বাংলাদেশের সাইবার আইন?

বাংলাদেশের সাইবার আইনগুলোর ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষাই দেয় যে নাগরিক সুরক্ষার নামে নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রণয়ন করলে তা টেকসই হয় না। সাইবার অপরাধ মোকাবিলা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ কিছু আধুনিক সংযোজন এনেছে ঠিকই, তবে আইনের ভাষা স্পষ্ট না হলে, স্বচ্ছতা না থাকলে এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এটি কেবল পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকবে। অতএব, প্রয়োজন একটি অধিকার ভিত্তিক, স্বচ্ছ, প্রযুক্তি-সংগতও গণমুখী সাইবার আইন যা সত্যিকার অর্থে নাগরিকদের সুরক্ষা দেবে, আর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করবে।

 

Comments


  • Facebook
  • Instagram
  • Youtube
  • LinkedIn

© 2022 Map of Justice
All rights reserved

bottom of page